ঝালকাঠির দুটি আসনে দুই নারী প্রার্থীর চ্যালেঞ্জ
আপডেট সময় :
২০২৬-০১-১৪ ১৬:২৩:১৬
ঝালকাঠির দুটি আসনে দুই নারী প্রার্থীর চ্যালেঞ্জ
মশিউর রহমান রাসেল,ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ
পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন নারী প্রার্থীদের টিকে থাকাই কঠিন, তখন ঝালকাঠির দুইটি সংসদীয় আসনে ভিন্ন দুটি রাজনৈতিক দল থেকে দুইজন নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে নির্বাচনী রাজনীতিতে।
ঝালকাঠির নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও সীমিত ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সামাজিক বাধা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও দলীয় কাঠামোর ভেতরের চাপ—সবকিছু অতিক্রম করেই এবার ঝালকাঠির দুইটি আসনে দুই নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। তাদের এই অংশগ্রহণ শুধু প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমানতা ও নেতৃত্বের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই দুই নারী হলেন— ঝালকাঠি–১ আসনে এনসিপির প্রার্থী ডা. মাহমুদা আলম মিতু এবং ঝালকাঠি–২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো।
রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া নিয়ে গঠিত ঝালকাঠি–১ আসনে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এনসিপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃ ডা. মাহমুদা আলম মিতু। তার মোট সম্পদ প্রায় ৭৪ লাখ টাকা এবং স্বামীর সম্পদ প্রায় ৫৩ লাখ টাকা। তরুণ ভোটারদের মধ্যে তিনি পরিবর্তন ও নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। তবে ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা হলে শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবেন কিনা সেটি নিয়ে ভোটারদের মাঝে রয়েছে সংশয়।
তবে আসনটিতে এই নারী প্রার্থীর বিপরীতে রয়েছেন একাধিক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। ঝালকাঠি-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী ড. মাহমুদা আলম মিতুর বিপরীতে মাঠে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও দলীয় মনোনীত প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম জামাল। এছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত আলোচিত প্রার্থী ড. ফয়জুল হক এবং বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী, সাবেক ছাত্রদল নেতা গোলাম আজম সৈকতসহ আরও প্রায় এক ডজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই সব প্রার্থীর ব্যক্তি জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ এলাকার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তাঁদের রয়েছে আলাদা পরিচিতি ও প্রভাব। বিশেষ করে বিএনপির প্রার্থী জামাল দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক থাকায় জনপ্রিয়তার দিক থেকেও তিনি এগিয়ে রয়েছেন।
এমন প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করে নিজ জন্মভূমিতে এসে প্রার্থী হওয়া এনসিপির প্রার্থী ড. মাহমুদা আলম মিতুর জন্য সামনের চ্যালেঞ্জ কতটা কঠিন হবে—সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি নিয়ে গঠিত ঝালকাঠি–২ আসনে বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। সাবেক এমপি জুলফিকার আলী ভুট্টোর সহধর্মিণী ইলেন ভুট্টোর শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি এবং পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। তার হলফনামা অনুযায়ী মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এলাকায় রাজনৈতিক পরিচিতি থাকলেও দলীয় ঐক্য গড়ে তোলাই তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকায় দল তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন বলে জানা গেছে। যদিও তিনি এখনো সাংগঠনিক নেতাকর্মীদের গ্রুপিং ভেঙে একত্রিত করতে পারেননি। বিভিন্ন প্রোগ্রামে হাতাহাতি, মারামারি, অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের কারনে গ্রুপিং আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
যদিও এ আসনটিতে পারিবারিক পরিচিতি ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো বরাবরই এগিয়ে, তবুও এবারের নির্বাচনী সমীকরণ তার জন্য সহজ নয়। ২০০১ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় দল এবারও তার ওপর আস্থা রেখেছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সাংগঠনিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব থাকায় মাঠপর্যায়ে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে তাকে। এর পাশাপাশি বড় তিনটি দলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিম ও ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থী ইসলামি বক্তা ডা. সিরাজুল ইসলাম সিরাজী—উভয়ের বাড়ি নলছিটি উপজেলায় হওয়ায় ইলেন ভুট্টোর ভোটব্যাংকে ভাগ বসানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিএনপি সারাদেশে, যে ১০ জন নারী প্রার্থী দিয়েছেতাদের মধ্যে ঝালকাঠি–২ আসনের প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো অন্যতম।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, নলছিটি উপজেলার ভোটারদের একটি বড় অংশ বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন—এই তিন দলই টানবে। ফলে সবার মূল ফোকাস থাকবে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভোটারদের ওপর। সেখান থেকে কে কতটা সমর্থন আদায় করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে চূড়ান্ত ফলাফল। তবে দলীয় কোন্দল ভুলে সবাই এক টেবিলে বসে কাজ করতে পারলে, এই নারী নেত্রীর জন্য ভোটার টানতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না—এমনটাই মনে করছেন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই নারীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান ও জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক কাঠামো ও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করাই তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে তাদের অংশগ্রহণ ঝালকাঠির নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে আরও দৃশ্যমান ও শক্তিশালী করছে।
তারা শুধু ভোটের দাবিদার নন; বরং তারা বহন করছেন একটি স্পষ্ট বার্তা— রাজনীতির মাঠে নারীর স্থান।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স